• বুধবার   ২৫ নভেম্বর ২০২০ ||

  • অগ্রাহায়ণ ১১ ১৪২৭

  • || ০৯ রবিউস সানি ১৪৪২

আজকের সাতক্ষীরা

আস্থার প্রতীক পিএসসি, যুগান্তকারী সব পদক্ষেপে আমূল বদলে গেছে

আজকের খুলনা

প্রকাশিত: ৯ মে ২০২০  

যেখানে ২০০১ থেকে ২০০৭ পর্যন্ত সরকারী কর্মকমিশনের (পিএসসি) নিয়োগের সুপারিশ ছিল মাত্র সাড়ে ১৬ হাজার সেখানে গত ১০ বছরে নিয়োগ পেয়েছেন সাড়ে ৬১ হাজার চাকরি প্রার্থী।

আগে যেখানে একটি ক্যাডার নিয়োগের ফল প্রস্তুত করতে সময় লাগত তিন থেকে চার মাস, এখন সেখানে সময় লাগছে ১২ থেকে ১৪ দিন। এ পরিসংখ্যানই বলে দেয় দেশের সরকারী চাকরির পরীক্ষা ও সুপারিশকারী সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান পিএসসির পরিবর্তনের চিত্র। তবে কেবল সংখ্যাগত পরিবর্তনই নয়, দ্রুত ফল প্রকাশের সফটওয়্যার প্রস্তুত ও ব্যবহার পাল্টে দিয়েছে পিএসসিকে। করোনা সঙ্কট সামলাতে সফটওয়্যার ব্যবহারেই মাত্র ৪৮ ঘণ্টায় সাত হাজার ডাক্তার ও নার্স নিয়োগের মতো অসম্ভবকে সম্ভব করা গেছে। অনুসন্ধান আর পিএসসির সদ্য বিদায়ী সদস্য ও বুয়েটের অধ্যাপক ড. আবদুল জব্বার খানের দেয়া একান্ত সাক্ষাতকারে বেরিয়ে এসেছে এক বিতর্ক থেকে আস্থার কেন্দ্রে চলে আসা পিএসসির অর্জনের নানা রহস্য।

এক সময় সরকারী কর্মকমিশন (পিএসসি) ছিল বিতর্কিত পরীক্ষা, নিয়োগ আর অনাস্থার কেন্দ্রে। জনমনে ছিল না প্রতিষ্ঠানটির প্রতি কোন আস্থা। বলা হয়, বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলটিতে দেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানটির মর্যাদা রীতিমতো ভূলুণ্ঠিত হয়। এ সময় পরীক্ষার বাইরে হাওয়া ভবনের তালিকা ধরে বিসিএস ক্যাডার নিয়োগের কেলেঙ্কারীও দেখে মানুষ। আস্থা হারান মেধাবীরা। অথচ আজ পিএসসিই হচ্ছে দেশের যে কোন পরীক্ষা ও নিয়োগের সবচেয়ে বড় আশ্রয়স্থল। পরিসংখ্যান বলছে, পিএসসির নতুন ভাবমুর্তির কারণেই মেধাবীরা এখন অনেক বেশি আকৃষ্ট হচ্ছেন বিসিএস ও নন-ক্যাডার নিয়োগ পরীক্ষায়। কয়েক বছর বিভিন্ন পাবলিক ও নিয়োগ পরীক্ষায় যেখানে প্রশ্নফাঁস একটি উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল সেখানে সরকারকে সবচেয়ে বেশি স্বস্তি দিয়েছে পিএসসি। ফলে প্রতিটি বিসিএসেই আবেদনকারী প্রার্থীর সংখ্যা বাড়ছে ব্যাপকভাবে।

নিয়োগের নথি পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ২০০১ থেকে ২০০৭ পর্যন্ত ক্যাডার এবং নন-ক্যাডার মিলিয়ে কমিশনের সুপারিশ ছিল ১৬ হাজার ৯৮৭ প্রার্থী। এর মধ্যে ক্যাডার ১২ হাজার ৭৯৪ জন এবং নন-ক্যাডার ৪ হাজার ১৯৪ জন। তবে গত ১০ বছরে ক্যাডার এবং নন-ক্যাডার মিলিয়ে সুপারিশ হয়েছে ৬১ হাজার ৬৯১ প্রার্থীর। যাদের মধ্যে ক্যাডার ২৮ হাজার ৫৯২ জন এবং নন-ক্যাডার ৩৩ হাজার ৯৯ জন।

কিন্তু কিভাবে পিএসসি আজ দ্রুত ও স্বচ্ছ নিয়োগের প্রতিষ্ঠান হয়ে উঠল? প্রতিষ্ঠানটির সদ্য বিদায়ী সদস্য ও বুয়েটের অধ্যাপক ড. আবদুল জব্বার খান সার্বিক পরিস্থিতিতে সন্তোষ প্রকাশ করে বলছিলেন, পিএসসি যে এখন শতভাগ স্বচ্ছতার সঙ্গে হাজার হাজার ক্যাডার ও নন-ক্যাডার নিয়োগের পরীক্ষা ও নিয়োগের সুপারিশ করতে পারছে তার প্রধান কারণ হচ্ছে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার আমাদের সেই কাজের স্বাধীনতা দিয়েছে। একই সঙ্গে আমাদের কাজ করার জন্য প্রয়োজনীয় সহযোগিতাও সরকার দিয়েছে বলে আজ একের পর এক নিয়োগের সুপারিশ করা সম্ভব হয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর একান্ত ইচ্ছার কারণেই মূলত আমরা কমিশন চেয়ারম্যান স্যারের নেতৃত্বে নানামুখী উদ্যোগ নিতে পেরেছি। একই সঙ্গে বাস্তবায়ন করা সম্ভবও হয়েছে। দ্রুত পরীক্ষা ও ফল প্রকাশসহ নিয়োগে পিএসসির আজকের সাফল্যের মূলে কিন্তু জনবল নিয়োগ নয় বরং কেবল যুগান্তকারী সব পদক্ষেপই পরিবর্তনের মূল কারণ।

পরীক্ষার ফল দ্রুত প্রকাশ করার জন্য বেশ কিছু সফটওয়্যার ডেভেলপ করেছে পিএসসি। যা দ্রুত ফল প্রকাশের গতি বাড়িয়ে দিয়েছে। আগে যেখানে একটি ক্যাডার নিয়োগের ফল প্রস্তুত করতে সময় লাগত তিন থেকে চার মাস এখন সেখানে সময় লাগছে ১২ থেকে ১৪ দিন। হাতিরঝিল প্রকল্প এবং মেট্রোরেল প্রকল্পসহ আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে জিওটেকনিক্যাল পরামর্শক হিসেবে কাজ করা অধ্যাপক ড. আবদুল জব্বার খান বলেছেন, ‘আমি মোট চারটি সফটওয়্যার তৈরি করেছি পিএসসির জন্য এবং এগুলো আমি মহান মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের উদ্দেশে উৎসর্গ করেছি। আপনারা জানেন পিএসসি ক্যাডার এবং নন-ক্যাডার নিয়োগের সুপারিশ করে থাকে। এই সুপারিশ করার ক্ষেত্রে জটিল কোটা পদ্ধতি অনুসরণ করা হতো। লিখিত এবং মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ প্রার্থীদের মেধা তালিকা থেকে এই বণ্টন কাজটি ম্যানুয়েলি করা হতো। আমি ২০১৫ সালে পিএসসিতে এসে সেই অবস্থাই দেখেছি। তখনি আমি সফটওয়্যার ডেভেলপ করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করি এবং নিজেই সেই কাজটি করার উদ্যোগ নিই। সবার ব্যবহারের সুবিধার জন্য আমি এক্সেল-ভিবিএ ব্যবহার করে প্রায় ছয় মাস সময় ব্যয় করে এই কাজটি করি। অনেক পরীক্ষার ফলাফল ট্রায়াল দেয়ার পরে এই সফটওয়্যারগুলো কমিশন সর্বসম্মতিক্রমে সদয় অনুমোদন দেয়। কিছুদিন আগে রাষ্ট্রীয় জরুরী প্রয়োজনে ক্যাডার পদে ২০০০ চিকিৎসক নিয়োগের সুপারিশও এই সফটওয়্যার ব্যবহার করেই করা হয়েছে। যার ফলে পিএসসি ৪৮ ঘণ্টার কম সময়ে এই জরুরী নিয়োগের সুপারিশ জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করতে সক্ষম হয়েছে।’

দেশের প্রায় সকল প্রতিষ্ঠানই এখন ফল প্রকাশে এ ধরনের কাজ করছে কোটি কোটি টাকা ব্য য়ে। আবার অনেকে করে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে। অধ্যাপক ড. জব্বার বলছিলেন, আমরাও আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে করতে পারতাম। একবার একটি বিদেশী কোম্পানিকে দিয়ে কাজটি করার চেষ্টা করা হয়েছিল। নিষ্ফল হয়েছে সেই চেষ্টা। তাছাড়া পিএসসির মতো একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের সব কাজ আউটসোর্সিংয়ে করা সমীচীন মনে হয়নি আমার কাছে। আমি যেহেতু একজন টেকনোলজিস্ট এবং যেহেতু বুয়েটে আমাদের সবারই কম্পিউটার প্রোগ্রামিং শিখতে হয় কাজেই নিজে করলেই এই জটিল কাজটি সহজে এবং কম সময়ে হবে বলে আমি মনে করেছি।

জানা গেছে, পিএসসি এখন নিজস্ব ব্যবস্থাপনাতেই প্রশ্নপত্র মুদ্রণের কাজ করছে। যা পরীক্ষার প্রশ্নপত্রকে করেছে শতভাগ স্বচ্ছ ও নির্বিঘ্ন । সদ্য বিদায়ী সদস্য ড. জব্বার জানিয়েছেন, ২০১৬ সাল থেকে নন-ক্যাডার প্রিলিমিনারি ও লিখিত পরীক্ষার প্রশ্নপত্র সম্পূর্ণ নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় এবং নিচ্ছিদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থায় পিএসসিই মুদ্রণ এবং বণ্টন করছে। অন্য কোন প্রেসে এই কাজটি এখন আর আউটসোর্সিং করা হচ্ছে না। এর ফলে প্রশ্নপত্রের গুণগত মান যেমন বেড়েছে তেমনি অর্থ ও শ্রমঘণ্টারও সাশ্রয় হয়েছে। সবচেয়ে বড় কথা একটি পরীক্ষা অনুষ্ঠানের জন্য বাইরের কোন প্রেসের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে না।

এর ফলে নন-ক্যাডার নিয়োগের সুপারিশ অনেক দ্রুততার সঙ্গে করা যাচ্ছে। গত পাঁচ বছরে পিএসসি প্রায় ২৫ হাজার নন-ক্যাডার পদে নিয়োগের সুপারিশ করেছে। এই ব্যবস্থাপনার কারিগরি দিকটি আমি ঠিক করে দিয়েছি। অবশ্যই কমিশনের চেয়ারম্যান স্যার এবং সকল বিজ্ঞ সদস্যের অকুণ্ঠ পৃষ্ঠপোষকতাও ছিল। দেশের স্বার্থে ভবিষ্যতেও এই ধারা অব্যাহত রাখতে হবে। মনে রাখতে হবে দায়িত্বপ্রাপ্তরা যত বেশি নিজেদের রক্ত পানি করবেন ততই দেশের ধমনীতে টগবগে রক্ত প্রবাহিত হবে।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, পিএসসির এই মুদ্রণ ব্যবস্থাপনার পরিসর এখনও ছোট। ৩৯ বিসিএসের (বিশেষ) এমসিকিউ টাইপ লিখিত পরীক্ষার ৪২ হাজার প্রশ্নপত্র আমরা এই ব্যবস্থাতেই মুদ্রণ করেছি। কিন্তু রেগুলার বিসিএসে প্রার্থী সংখ্যা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাওয়ায় সেগুলোর প্রিলিমিনারি টেস্ট এবং আবশ্যিক লিখিত পরীক্ষার প্রশ্নপত্র এখনও নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় করা সমীচীন হবে না। তবে ভবিষ্যতে টেকনিক্যাল/প্রফেশনাল লিখিত পরীক্ষার প্রশ্নপত্র করার বিষয়টি কমিশন বিবেচনা করতে পারে।

এদিকে প্রশ্নব্যাংক তৈরি নিয়েও কথা হচ্ছে। ড. জব্বার বলেছেন, পিএসসির সব পরীক্ষা আরও দ্রুততর সময়ে অনুষ্ঠানের জন্য প্রশ্নব্যাংক অতীব জরুরী হয়ে পড়েছে। আমি এ সংক্রান্ত একটি কমিটিতে কাজ করেছি। সুপারিশ অনুযায়ী কমিশনের অনুমোদনক্রমে এখন নন-ক্যাডার পরীক্ষাগুলোর জন্য একটি ভৌত প্রশ্নব্যাংক প্রস্তুত করা হয়েছে। যেদিন পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয় সেদিনই নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় প্রশ্নপত্র মুদ্রণের আগে দৈবচয়ণের মাধ্যমে প্রশ্নপত্র বাছাই করা হয়। এর ফলে একদিকে যেমন প্রশ্নপত্রের গোপনীয়তা ও মান বেড়েছে অন্যদিকে অর্থ ও শ্রমঘণ্টারও সাশ্রয় হয়েছে। সুখের বিষয়, একটি ডিজিটাল প্রশ্নব্যাংক করার ডিপিপি একনেকে অনুমোদিত হয়েছে। পরামর্শক নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। করোনা পরিস্থিতির পর এ বিষয়ে যথাশীঘ্র কাজ আরম্ভ হবে বলে আশা করা যায়।

আপনি তো ৩৮ বিসিএসের দায়িত্বপ্রাপ্ত সদস্য ছিলেন রেজাল্ট প্রকাশ করাত এখনও বাকি; প্রার্থীরাও অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন। আপনার অবর্তমানে এখন এই রেজাল্ট প্রস্তুতির কাজ কীভাবে হবে?

এ বিষয়ে ড. জব্বার বলেন, দেখুন, কমিশনে একটি চমৎকার টিম রয়েছে। আর এই টিম গড়ে তুলেছেন কমিশন চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ সাদিক। আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি বর্তমান কমিশনের ৩৮ বিসিএসের ফল প্রকাশের অসমাপ্ত কাজ সুসম্পন্ন করার জন্য অল্প কিছুদিন সময়ই যথেষ্ট। সত্যি কথা বলতে, আমরা রেজাল্ট একবার প্রায় শেষই করে ফেলেছিলাম। মার্চের মাঝামাঝি সময়ে রেজাল্ট প্রকাশ করার প্রস্তুতি নিয়েই এগুচ্ছিলাম।

এরই মধ্যে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে বিভিন্ন ক্যাডারে আরও আড়াইশো পদের নিয়োগের জন্য চাহিদা আসে। এ অবস্থায় আমরা চলমান প্রক্রিয়া বাতিল করে আবার নতুন করে বণ্টনের কাজ শুরু করি। আশা ছিল এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহেই ফল প্রকাশ করব। বাদ সাধল কোভিড পরিস্থিতি। ২৫ মার্চের পর থেকে এখন পর্যন্ত আর এই কাজটিতে হাতই দিতে পারলাম না আমরা। শুধু জরুরী রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনে মাঝে ২০০০ ডাক্তার এবং ৫০৫৪ জন নার্স নিয়োগের সুপারিশের জন্য কাজ করতে পেরেছি আমরা। ৩৮ বিসিএসের প্রার্থীদের মনের অবস্থা কমিশন অনুধাবন করতে পারছে। কমিশন তাদের অভিভাবক। তাই সন্তানতুল্য প্রার্থীদের উদ্বেগ, উৎকণ্ঠার প্রতি আমাদের পূর্ণ মমতা রয়েছে। করোনা পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হয়ে এলে কমিশন বড়জোড় দুই সপ্তাহের মধ্যেই নিয়োগের জন্য সুপারিশের কাজটি সুসম্পন্ন করতে সক্ষম হবে।

গত পাঁচ বছরে সবচেয়ে বেশি বিসিএসের ফল প্রকাশ করেছে পিএসসি। বুয়েটের এ অধ্যাপক জানিয়েছেন, পাঁচ বছর মেয়াদের মধ্যে পিএসসি প্রায় ছয়টি বিসিএস পরীক্ষার চূড়ান্ত ফল প্রকাশ করেছে এবং ক্যাডার পদে নিয়োগের জন্য সুপারিশ করেছে। ৩৮ বিসিএসের সুপারিশ চূড়ান্ত হলে প্রায় ১৫ হাজার ক্যাডার সদস্যের জন্য সুপারিশ সুসম্পন্ন হবে। এত বিশাল মাত্রায় ক্যাডার এবং সরাসরি পরীক্ষার মাধ্যমে নন-ক্যাডার পদে অতীতের কোন পাঁচ বছর সময়কালের মধ্যে নিয়োগের সুপারিশ করেনি পিএসসি। এক্ষেত্রে পিএসসির গতিময়তা যেমন ছিল তেমনি সরকারের তরফেও প্রশংসনীয় আন্তরিকতা ছিল।

গত ১০ বছরে অসংখ্য নন ক্যাডারে নিয়োগ আশা জাগিয়েছে আরও অনেক বেশি। প্রতি বিসিএস থেকে কত সংখ্যক প্রার্থী এসব চাকরি পাচ্ছেন? ড. জব্বার বলেছেন, এটি শেখ হাসিনার সরকারের একটি অসামান্য অবদান। অতীতে একজন প্রার্থী বিসিএস লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার উত্তীর্ণ হয়ে যদি পদ স্বল্পতার কারণে কোন ক্যাডার পদে সুপারিশপ্রাপ্ত না হতো তাহলে তার জন্য পৃথক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ না হয়ে প্রথম না দ্বিতীয় শ্রেণীর চাকরি পাবার কোন পথ খোলা থাকত না।

এটি এক ধরনের প-্রশ্রমের মতো ছিল। বর্তমান সরকার ২০১০ সালে একটি যুগান্তকারী আইন করে দেন যার ফলে পদস্বল্পতার কারণে যেসব প্রার্থী ক্যাডার পদে সুপারিশ পান না তাদের সম্মতি জ্ঞাপন সাপেক্ষে আর কোন পরীক্ষা ছাড়াই প্রথম বা দ্বিতীয় শ্রেণীর নন-ক্যাডার পদে সুপারিশের জন্য বিবেচিত হওয়ার পথ উন্মোচিত হয়। এর ফলে প্রতি বিসিএস থেকেই আরও প্রায় দুই থেকে তিন হাজার প্রার্থীর সরকারী চাকরি পাওয়ার পথ প্রশস্ত হয়েছে। অবশ্য বিষয়টি নির্ভর করে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় থেকে কী পরিমাণ চাহিদা পিএসসির কাছে আসছে তার ওপর। পরবর্তী বিসিএসের ফলাফল প্রকাশের পূর্ব পর্যন্ত যতগুলো চাহিদা পাওয়া যায় তার সবটাই পিএসসি দিয়ে থাকে। এই বণ্টন প্রক্রিয়াটি প্রার্থীর মেধা ও নিয়োগ বিধিতে বর্ণিত যোগ্যতার ভিত্তিতে সফটওয়্যারের মাধ্যমে করা হয়।

পিএসসির পরীক্ষায় মেধাবীরা আকৃষ্ট হওয়া নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এখন পাবলিক লাইব্রেরির সামনে সকাল থেকে ছেলেমেয়েরা লাইন ধরে অপেক্ষা করে। লাইব্রেরি খোলা মাত্রই তারা ভেতরে ঢুকে পড়তে বসে যায়। এই চিত্রটি আমাদের একটি পরিষ্কার বার্তা দেয়। এর মানে হচ্ছে প্রার্থীরা বুঝতে পেরেছে যথেষ্ট প্রস্তুতি না নিয়ে ক্যাডার বা নন-ক্যাডার চাকরি পাবার অন্য কোন পথ এখন আর নেই। যদিও দুঃখজনকভাবে অনেকে এখনও কেউ কেউ বিকল্প পথ খোঁজে এবং অযথা প্রতারণার শিকার হয়। বাস্তবতা হলো কমিশনের অনেক সদস্যের সন্তান-সন্ততিই ক্যাডার বা নন-ক্যাডার চাকরি পায়নি। এটি থেকেই বোঝা যায় কমিশন কতটা স্বচ্ছতা এবং নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছে। একজন চা দোকানদার বা রিক্সাচালকের সন্তানও যেমন ক্যাডার পদে সুপারিশপ্রাপ্ত হচ্ছেন তেমনি একজন কোটিপতির সন্তান হয়তো কোন পদের জন্যই সুপারিশ পাচ্ছেন না।

কিন্তু ডাক্তার, প্রকৌশলী, কৃষিবিদরা টেকনিক্যাল ক্যাডার পদে না গিয়ে জেনারেল ক্যাডারের দিকে ঝুঁকছেন কেন? এমন প্রশ্ন করা হলে আবদুল জব্বার খান বলেন, প্রথমত, নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির শর্তানুযায়ী জেনারেল ক্যাডারের জন্য প্রার্থীদের ন্যূনতম যোগ্যতা হিসেবে যেকোন স্বীকৃত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রী চাওয়া হয়। কাজেই আইন অনুযায়ী যে কেউ যেকোন জেনারেল ক্যাডার পদের জন্য তার পছন্দ দিতে পারেন। কোন আইন দ্বারা এটিকে বারিত করা হয়নি এবং এ নিয়ে প্রশ্ন তোলারও কোন সুযোগ নেই।

দ্বিতীয়ত, বিভিন্ন ক্যাডার সার্ভিসের সুযোগ-সুবিধার মধ্যে রয়েছে আকাশ-পাতাল বৈষম্য। তাই অনেক মেধাবী ছেলেমেয়েই তার অনার্স-মাস্টার্স ডিগ্রীর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বিষয়ে কলেজের শিক্ষক, ডাক্তার বা প্রকৌশলী না হয়ে চলে যাচ্ছে পুলিশ, প্রশাসন, বা পররাষ্ট্র ক্যাডারে। সবাইকে যার যার জায়গায় ধরে রাখতে হলে এসব বৈষম্য দূর করতে হবে প্রার্থীকে দোষারোপ করার তো কোন কারণ দেখি না। তৃতীয়ত, সব ক্যাডারে নবম গ্রেড থেকে প্রথম গ্রেড পর্যন্ত সোপান নেই। এটি এক যাত্রায় পৃথক ফলের মতো। সবাই ক্যাডার সার্ভিসে যোগদান করল একই ব্যাচে অথচ কেউ গ্রেড-১ এ যেতে পারবে কেউ পারবে না, এ হয় না।

এতে কিছুদিনের মধ্যেই বিভিন্ন ক্যাডারের সদস্যদের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়, কর্মস্পৃহা হারিয়ে যায়, দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। চতুর্থত, টেকনিক্যাল এবং প্রফেশনাল ক্যাডার সার্ভিসগুলোতে অনেক নতুন পদ সৃজন করা প্রয়োজন। আমরা যে ২০৪১ ভিশন নিয়ে এগুচ্ছি সেখানটায় যেতে হলে এই ক্যাডার সার্ভিসগুলোকে অনেক বেশি মজবুত ভিতের ওপর দাঁড় করাতে হবে। যেমন- ডিজিটাল বাংলাদেশের পথে আমরা এগিয়ে যাচ্ছি অথচ এখন পর্যন্ত আইসিটি ক্যাডার নেই। এটি হওয়া অত্যন্ত জরুরী। এই কাজগুলো যত দ্রুততম সময়ের মধ্যে সম্ভব করতে হবে। তাহলেই বাংলাদেশ বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা হবার পথে অনেকটা এগিয়ে যাবে।

গত পাঁচ বছরে পিএসসির অবকাঠামোগত উন্নয়ন নজর কেড়েছে সবার। এ বিষয়ে ড. জব্বার বলেছেন, এজন্য আমি চেয়ারম্যান স্যার, পিএসসি সচিবালয় এবং পিডব্লিউডিকে বিশেষভাবে ধন্যবাদ জানাবো। পিএসসি চত্বরে গত নির্বাচনের আগে ১৬ ডিসেম্বরে মহান মুক্তিযুদ্ধে প্রজাতন্ত্রের শহীদ কর্মচারীদের উদ্দেশে ১৬ ফুট উচ্চতার একটি সৌধ স্থাপন করা হয়েছে- নাম দেয়া হয়েছে ‘মৃত্যুঞ্জয়ী’।

একই দিনে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের একটা ম্যুরালও উন্মোচন করা হয়েছে। পূর্বের মিলনায়তনকে নতুন করে ঢেলে সাজানো হয়েছে, আধুনিকীকরণ করা হয়েছে- নাম দেয়া হয়েছে ‘৭১ মিলনায়তন’। আমি যখন পিএসসিতে এসেছি তখন এখানে কোন জাতীয় দিবস পালন হতে দেখিনি।

তিনি আরও বলেন, বর্তমান চেয়ারম্যান স্যার সব জাতীয় দিবস পালনের উদ্যোগ নিয়েছেন এবং নিয়মিতভাবেই এখন এগুলো পালন করা হচ্ছে। পিএসসি ভবনের চারটি তলার উর্ধমুখী সম্প্রসারণের কাজ চলছে। সাতটি আঞ্চলিক অফিসকে আধুনিক করার প্রয়াসে প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে, জমি অধিগ্রহণের কাজ চলছে, নক্সা অনুমোদন করা হয়েছে। এক কথায় বলতে হলে বলতে হয় বাংলাদেশ সরকারী কর্মকমিশন প্রাণ চাঞ্চল্যে ভরপুর একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে কর্মকান্ড চালিয়ে যাচ্ছে।

অপর এক প্রশ্নে তিনি বলেন, বর্তমান সরকারের মেয়াদকালে রাষ্ট্র, সরকার এবং জনগণকে বর্তমান কমিশন অদ্যাবধি যেভাবে স্বস্তিতে রেখেছে এর ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হবে। বাংলাদেশ সরকারী কর্মকমিশন শুধু একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানই নয়, এটি এদেশের জন্য বিশুদ্ধ রক্ত সঞ্চালকও বটে। এই প্রতিষ্ঠানটিকে রাষ্ট্রের স্বার্থে প্রজ্ঞা ও জনগণের মনোভাব অনুধাবন করে সংবিধান সমুন্নত রেখে স্বাধীনভাবে কাজ করে যেতে হবে। এর মধ্যেই নিহিত রয়েছে ভিশন ২০৪১ এর বাংলাদেশের স্বপ্ন বাস্তবায়নের সম্ভাবনার বীজ।

 

আজকের সাতক্ষীরা
আজকের সাতক্ষীরা