• শনিবার   ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২০ ||

  • আশ্বিন ৪ ১৪২৭

  • || ০১ সফর ১৪৪২

আজকের সাতক্ষীরা
৪৬

প্রতারক সাহেদ করিম ডুবিয়েছে সাতক্ষীরাকে

আজকের সাতক্ষীরা

প্রকাশিত: ১৮ আগস্ট ২০২০  

‘বিলেতে সাড়ে সাত শ’ দিন’ লেখক মুহম্মদ আবদুল হাইয়ের বইটি পড়েছিলাম ৫০ বছর আগে কলেজে পড়াকালিন। এতে পেরেছিলাম ‘রিজেন্ট পার্কের চিড়িয়াখানা’ গল্প। পরবর্তীকালে শব্দটির সাথে নতুন করে পরিচয় হলো বাংলাদেশে ‘রিজেন্ট এয়ার ওয়েজ’ এর উড়ালের মাধ্যমে। ‘রিজেন্ট’ কথাটির বাংলা অর্থ রাজ প্রতিনিধি।

সেই হিসাবে লন্ডনের রিজেন্ট পার্কের চিড়িয়াখানা আর রিজেন্ট এয়ার ওয়েজকে রাজ প্রতিনিধি হিসেবে মূল্যায়ন করা যায়। কিন্তু এই রিজেন্ট যখন প্রতারণার কৌশল হয় তখন শব্দটি নেতিবাচক হিসেবে সামনে চলে আসে। আর এজন্য দায়ী সাতক্ষীরা থেকে চলে যাওয়া রাজধানী ঢাকার ধুরন্ধর প্রতারক সাহেদ করিম। সারা বিশ^ যখন করোনার থাবায় কম্পমান তখন এই সাহেদ দিব্যি তার প্রতারণার অপকৌশল চালিয়ে গেছে। পর্যাপ্ত সরঞ্জাম না থাকার পরও সে করোনা পরীক্ষার নামে দেশবাসীর সাথে প্রতারণা করেছে। পরীক্ষা ছাড়াই নিগেটিভ পজিটিভ রিপোর্ট বানিয়ে দিয়েছে। হাজার হাজার মানুষের সাথে এধরণের প্রতারণা করে সে নিজেকে ‘রিজেন্ট’ হিসেবে প্রতিভাত করতে চেয়েছিল। ‘রিজেন্ট’ শব্দটি তাই সাহেদের মতো কোনা প্রতারকের প্রতিষ্ঠানে থাকতে পারে না। এটি বেমানান। সাহেদ করিম দেশজুড়ে প্রতারণার মাধ্যমে অপমান করেছে সাতক্ষীরাবাসীকে।

সাতক্ষীরায় জন্ম নেওয়া ঢাকার সেই প্রতারক নিজেকে আর আড়াল করে ধাপ্পাবাজি করতে পারলো না। সাদা চুল কালো করে, গোঁফ ছেটে, বোরকা পরে নিজেকে নারী সাজিয়ে নৌকায় চড়ে ভারতে পলায়নও বন্ধ হয়ে গেলো। র‌্যাব এর জালে ধরা পড়ে সাহেদ করিম এখন গাত্র যন্ত্রণায় ছটফট করছে। ধরা পড়ার আগে সে বলেছিল আমি একজন নারী, আমাকে কেনো বিব্রত করছেন আপনারা। পরে বলেছিল আমি একজন ভিআইপি। আমার সাথে এমন আচরণ করলে তার ফল ভালো হবে না। বলেছিল আমি একটি দৈনিক পত্রিকার সম্পাদক। এসব ধান্দাবাজির কথা বলেও সাহেদ র‌্যাবের জাল ছিড়তে ব্যর্থ হয়েছে।

দেশজুড়ে তন্নতন্ন করে খোঁজাখুঁজির পর অবশেষে ১৫ জুলাই ভোরে বোরকা পরা সাহেদ করিমকে আবিষ্কার করা গেলো সাতক্ষীরার দেবহাটা উপজেলার পারুলিয়া ইউনিয়নের কোমরপুর গ্রামের ইছামতির সাথে সংযুক্ত লাবণ্যবতী নদীর একটি খাল কুমড়োর খালে ভাসমান নৌকায়। র‌্যাব দেখে মাঝি পানিতে ঝাপ দিলেও ‘ভিআইপি’ সাহেদ করিম কাপড়চোপড় বিশেষ করে বোরকা পরা অবস্থায় খালে ঝাঁপাতে না পেরে সে নিজেকে প্রমান করলো তার ‘ষোলো আনাই মিছে’। মুহূর্তেই সাহেদ করিম ‘টক শো থেকে কাদামাটি মাখা আসল সাহেদ করিম’ হিসেবে র‌্যাবের জালে জড়িয়ে গেলো।
এই সাতক্ষীরা শহরেই পৈতৃক বাড়ি সাহেদ করিমের। তার দাদা এমদাদুল করিম ১৯৪৭ এ দেশভাগের পরই চলে আসেন পূর্ব পাকিস্তানে। চাকরি নেন মহকুমা তথ্য অফিসার হিসেবে। সাহেদের বাবা সিরাজুল করিম। মা সাফিয়া করিম। সাফিয়া করিম ২০১০ সালে মৃত্যুর দিন পর্যন্ত ছিলেন জেলা মহিলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। সেই হিসেবে তিনি রাজনৈতিক অঙ্গনে বেশ পরিচিত ছিলেন। সাহেদ করিম সেটাকে ব্যবহার করে নিজেকে এগিয়ে নিতে চেয়েছিল। কিন্তু প্রতারণার জাল অবশেষে লন্ডভন্ড হয়ে গেলো। একটি পিস্তল ও কয়েক রাউন্ড গুলিসহ হাতেনাতে ধরা পড়লো প্রতারক সাহেদ করিম।

নিজেকে লোকচক্ষুর আড়াল করার জন্যই সাহেদ করিম বোরকা পরে ঢাকা থেকে সাতক্ষীরায় এসেছিলেন বলে জানা গেছে। এমনকি পারুলিয়ার এই কোমরপুর গ্রামের যে এলাকায় তিনি আত্মগোপনে থাকতেন সেখানেও তিনি ছিলেন বোরকা আবৃত। যে নৌকায় তিনি পার হচ্ছিলেন সেটির মালিক জনৈক বাচ্চু খোড়া। ’৭১ সালে মুক্তিযোদ্ধাদের পেতে রাখা মাইন বিস্ফোরণে তার একটি পা উড়ে যায়। এই নৌকায় বাচ্চুখোড়া সীমান্ত পথে মানুষ পারাপার ও চোরাচালানের সাথে জড়িত ছিলেন। দুই বছর আগে বাচ্চু মাঝি মারা গেলে তার ছেলেরা নৌকার মালিক হন।

নিজের কাঁচাপাকা চুল দেখে তাকে যাতে কেউ চিহ্নিত করতে না পারে এজন্য সাহেদ করিম তার চুল ছেঁটে ও রং করে সম্পূর্ণ কালো করে ফেলেন এমনকি গোঁফও কেটে ফেলেন। ধরা পড়ার সময় তার কাছে একটি বাটনযুক্ত সাধারণ মোবাইল ফোন পাওয়া যায়। তিনি এসময় র‌্যাবের সাথে খানিকটা ধস্তাধস্তি করতে গিয়ে আরও কাদামাটি মেখে যান। প্রত্যক্ষদর্শী গ্রামবাসী জানান, র‌্যাব সদস্যরা ভোর সাড়ে তিনটা থেকে চারটার মধ্যে কুমড়োখালি খালের ওপর বেইলী ব্রিজের ধারে অবস্থান নেন।

দাদা এমদাদুল করিম সাতক্ষীরা শহরের পলাশপোল কামাননগর এলাকায় জমি কিনে বাড়ি করেন। এছাড়াও দেবহাটা উপজেলার রাঙাসীসা এলাকায় এমদাদুল করিমের ৩৫০ বিঘা জমি ছিল। এমদাদুল করিমের ছেলে সিরাজুল করিম এবং তার একমাত্র ছেলে সাহেদ করিম। সাহেদ করিম ১৯৯৮ সালে সাতক্ষীরা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে দশম শ্রেণিতে লেখাপড়া করতো। কিন্তু নানা অনৈতিক কাজের কারণে তাকে সাতক্ষীরা ছেড়ে ঢাকার মোহাম্মদপুরে দাদা এমদাদুল করিমের বাসায় পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। পরে সাহেদ করিম ঢাকার পিলখানা রাইফেলস হাইস্কুল থেকে এসএসসি পাশ করেন। তিনি এরপর আর লেখাপড়া করেননি। সাহেদ করিম তার নিজের নামের খন্ডিত অংশ মো. সাহেদ ব্যবহার করতেন। তার বাবা সাতক্ষীরা শহরের সব জমি বিক্রি করে স্থায়ীভাবে ঢাকায় চলে যান। সাহেদ করিম বাবার টাকা ও প্রতারণার মাধ্যমে উপার্জিত টাকা নিয়ে ঢাকার উত্তরায় প্রথমে একটি ক্লিনিক গড়ে তোলেন। পরে সেখানেই গড়ে তোলেন রিজেন্ট হাসপাতাল। এছাড়াও তিনি কয়েকটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। এসবের মাধ্যমে সাহেদ করিম শুরু করে প্রতারণা।

একাদশ সংসদ নির্বাচনে নিজেকে সাতক্ষীরা-২ আসনের সংসদ সদস্য হবার সাধ হয়েছিল তার। মা সাফিয়া করিমের আওয়ামী লীগের রাজনীতির সূত্র ধরে সাহেদ করিম ঢাকায় রাজনৈতিক মহলে বেশ পরিচিতি পান। এই সুযোগে তিনি একাদশ সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের কর্মী হিসেবে মনোনয়নপত্র ক্রয় করেন। ২০১৮ সালের ৯ নভেম্বর সেটি পূরণ করে তিনি জমাও দেন। এর আগ পর্যন্ত তার নির্বাচনী অভিলাস সম্পর্কে সাতক্ষীরায় কেউ জানতেন না। এ প্রসঙ্গে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মো. নজরুল ইসলাম বলেন, সাতক্ষীরা সদর আসন থেকে যে ১৪ জন আওয়ামী লীগের পক্ষে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছিলেন আমরা তাদের সাথে ঢাকায় ছিলাম। সেখানে জানতে পারলাম প্রয়াত নেত্রী সাফিয়া করিমের ছেলে সাহেদ করিম আওয়ামী লীগ পরিচয়ে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন এবং জমাও দিয়েছেন। তবে শেষ পর্যন্ত তিনি মনোনয়ন পাননি। ফলে তার নির্বাচনী সাধও মেটেনি। আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক আরও বলেন, সাহেদ করিম সাতক্ষীরা আওয়ামী লীগের কোন পর্যায়ের কমিটির সঙ্গে জড়িত নন। এমনকি তিনি সাধারণ কর্মীও নন।

চারদলীয় জোট সরকারের আমলে কথিত ‘আওয়ামী লীগ নেতা সাহেদ করিম নিজেকে বিএনপির একনিষ্ঠ নেতা বলে দাবি করতেন। এসময় ঢাকা থেকে তার নিয়মিত যোগাযোগ ছিল হাওয়া ভবনের সাথে। এমনকি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সাথেও তার ঘনিষ্ঠতা গড়ে ওঠে। এসময় সাহেদ করিম বিএনপির সরকারদলীয় নেতা হিসেবে ঢাকায় ছড়ি ঘুরিয়েছেন। পরে বিএনপি সরকার বিদায় নিলে তিনি ভোল পাল্টে হয়ে যান আওয়ামী লীগ নেতা। এই বহুরূপী সাহেদ করিম এভাবেই মানুষের সাথে প্রতারণা করতে গিয়ে তিনি নিজেকে কখনও সেনা কর্মকর্তা, কখনও প্রধানমন্ত্রীর অতি পরিচিতজন, কখনও আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের নেতা এবং কখনও পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে পরিচয় দিয়ে আসছিলেন। এই ধুরন্ধর অশিক্ষিত প্রতারক সাহেদ অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড ম্যানেজ করে যে কোনো স্থানে যাবার পথ করে নেয়।

সাহেদ করিম সাতক্ষীরা শহরের আমতলায় একজন ব্যবসায়ীর মেয়েকে বিয়ে করেন। মাত্র কিছুদিনের মধ্যেই তাদের মধ্যে ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়। এর কিছুদিন পর সাহেদ করিম সাতক্ষীরায় এসেছিলেন। তার আগে তিনি একটি সন্তানসহ অপর এক নারীকে বিয়ে করেন। তাকে নিয়ে সাতক্ষীরায় এসেছিলেন তিনি। সে স্ত্রীও পরে পরিত্যক্ত হয়েছেন। বর্তমানে তার এক স্ত্রী রয়েছেন বলে খবর পাওয়া গেছে।

গ্রেপ্তারের পর সাহেদ করিমকে সরাসরি নিয়ে আসা হয় সাতক্ষীরা স্টেডিয়ামে। এরপর তাকে নিয়ে যাওয়া হয় শহরের তালতলায় র‌্যাব-৬ কোম্পানী কমান্ডার অফিসে। সেখানে দফায় দফায় জিজ্ঞাসাবাদের পর তাকে ফের নিয়ে যাওয়া হয় সাতক্ষীরা স্টেডিয়ামে। ততক্ষণে দুটি হেলিকপ্টার স্টেডিয়ামে অবতরণ করেছে। র‌্যাবের প্রেস ব্রিফিং শেষে সাহেদ করিমকে হেলিকপ্টারে তোলা হয়। তাকে নিয়ে র‌্যাব সদস্যরা উড়ান দেন ঢাকার উদ্দেশ্যে। এরপর র‌্যাব হেফাজতে থাকার পর সাহেদ করিমকে দশ দিনের রিমান্ড শেষে দেবহাটা থানার অস্ত্র মামলায় নিয়ে আসা হয় আদালতে। আদালত তাকে জেল হাজতে পাঠান।

রিজেন্ট হাসপাতালে করোনা টেস্ট নিয়ে সাতক্ষীরার সাহেদ করিমের প্রতারণায় বিব্রত ছিলেন এই এলাকার মানুষ। তারা বলছেন-সাহেদ করিম সাতক্ষীরাকে ডুবিয়েছেন। তারা তার কথা শুনলেই ঘৃণা প্রকাশ করছেন। এভাবে কয়েকদিন ধরে সাহেদ করিম হয়ে ওঠেন সাতক্ষীরার ‘টক অব দ্য টাউন’। বুধবার ভোরে গ্রেপ্তারের পর সাতক্ষীরার মানুষ যেন দম ছাড়লেন। তারা জানতে পারলেন সাহেদ করিম গ্রেপ্তার হয়েছে। তারা স্বস্তি লাভ করেন। এখন শুধুই অপেক্ষা বিচারের মাধ্যমে তার উপযুক্ত সাজা। লেখক: সাতক্ষীরা প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি

আজকের সাতক্ষীরা
আজকের সাতক্ষীরা
সাতক্ষীরা বিভাগের পাঠকপ্রিয় খবর