• সোমবার   ১৮ জানুয়ারি ২০২১ ||

  • মাঘ ৫ ১৪২৭

  • || ০৫ জমাদিউস সানি ১৪৪২

আজকের সাতক্ষীরা

কোরআনে প্রতিবন্ধীর সম্মান

আজকের সাতক্ষীরা

প্রকাশিত: ৩০ নভেম্বর ২০২০  

মানুষের অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় বিশ্বজনীন ধর্মের নাম ইসলাম। যে ধর্মে যে কোনো যুগের যাবতীয় সমস্যার সমাধান ও দিকনির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

ইসলামের দৃষ্টিতে সব মানুষ সমান। ইমান ও তাকওয়া হচ্ছে মানুষের মর্যাদার মানদণ্ড। যে যত বেশি মুত্তাকি, আল্লাহ তাকে তত ভালোবাসেন। মানুষ আশরাফুল মাখলুকাত তথা সৃষ্টির সেরা জীব। ইসলাম উঁচু-নিচু, সাদা-কালো, ধনী-গরিব, ছোট-বড় সবার অধিকার নিশ্চিত করেছে।

শুধু মানুষ নয় বরং সৃষ্টির সব স্তরের সম্ভাব্য সব ধরনের বৈষম্য ও ভেদাভেদ দূর করে ভারসাম্যপূর্ণ জীবনের এক অনুপম দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।

আল্লাহতায়ালা মানুষকে জ্ঞান এবং বিবেক দিয়েছেন। আমরা আল্লাহর সেই সৃষ্টির মধ্যে কিছু কিছু সৃষ্টিকে অস্বাভাবিকও দেখতে পাই। এ অস্বাভাবিক সৃষ্টির রহস্য হল বান্দা যেন বুঝতে পারে, তিনি স্বাভাবিক সুন্দর সৃষ্টির পাশাপাশি ব্যতিক্রমও করতে সক্ষম।

এভাবে আল্লাহ যাকে বিপদাপদ থেকে নিরাপদ রাখেন; সে যেন আল্লাহর দয়া ও করুণার কথা ভেবে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে। আল্লাহ চাইলে তার ক্ষেত্রেও তেমন করতে পারতেন। এক্ষেত্রে বিশেষভাবে প্রতিবন্ধীদের কথা বলা যায়, যারা পদে পদে চরম লাঞ্ছনা, গঞ্জনা ও বঞ্চনার মধ্যে দুর্বিষহ জীবন কাটায়।

এমন ব্যক্তিকে আল্লাহতায়ালা এ সমস্যার বিনিময়ে তাঁর সন্তুষ্টি, দয়া, ক্ষমা ও জান্নাত দিতে চান।

তিরমিজি শরিফে বর্ণিত হাদিসে কুদসিতে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘আমি যার প্রিয় চোখ নিয়ে নিই, অতঃপর সে ধৈর্য ধারণ করে এবং নেকির আশা করে; আমি তার জন্য এর বিনিময়ে জান্নাত ছাড়া অন্য কিছুতে সন্তুষ্ট হই না’ (হাদিস নং-১৯৫৯)।

আভিধানিক অর্থে প্রতিবন্ধী হচ্ছে- দৈহিক শক্তির একান্ত অভাব বা অঙ্গহানির কারণে যারা আশৈশব বাধাপ্রাপ্ত, মূক, বধির ও অন্ধ প্রভৃতি।

পরিভাষায় প্রতিবন্ধী বলা হয়- দেহের কোনো অংশ বা তন্তু আংশিক বা সম্পূর্ণভাবে, ক্ষণস্থায়ী বা স্থায়ীভাবে তার স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা হারিয়ে ফেলা। (সংসদ বাংলা অভিধান-৩৮২, উইকিপিডিয়া বাংলা)।

প্রতিবন্ধকতা মানবজীবনের এক দুর্বিষহ অধ্যায়ের নাম। জন্মগত, দুর্ঘটনা কিংবা অসুস্থতা যে কারণেই হোক, সব ধরনের প্রতিবন্ধীর সঙ্গে উত্তম আচরণ এবং তার উপকারে হাত বাড়িয়ে দেয়ার শিক্ষাই রয়েছে ইসলামে। রাসূল (সা.) বলেন, ‘তোমরা ক্ষুধার্তকে খাবার দাও, রোগীর সেবা কর এবং বন্দিকে ছেড়ে দাও’ (বুখারি, হাদিস নং-৫৩৭৩)।

তাফসিরে কবিরে এসেছে, একবার রাসূল (সা.) মক্কার নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি উতবা, আবু জেহেল, আব্বাস, উবাই এবং উমাইয়া ইবনে খলফকে ইসলাম গ্রহণের জন্য আহ্বান করছিলেন। ঠিক তখন অন্ধ সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনে উম্মে মাকতুম (রা.) বারবার এ কথা বলছিলেন, ‘হে আল্লাহর রাসূল (সা.)! আল্লাহ আপনাকে যা শিখিয়েছেন, তা আপনি আমাকে শিখিয়ে দিন।’

অন্ধ হওয়ার কারণে তিনি দেখতে পাননি, রাসূল (সা.) কার সঙ্গে কথা বলছিলেন। তার কথায় আলোচনার মাঝে ব্যাঘাত ঘটলে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর চেহারায় কিছুটা বিরক্তি ফুটে ওঠে।

তখন আল্লাহতায়ালা নাজিল করেন- ‘তিনি ভ্রুকুঞ্চিত করলেন এবং মুখ ফিরিয়ে নিলেন। কারণ, তাঁর কাছে এক অন্ধ আগমন করল। আপনি কি জানেন, সে হয়তো পরিশুদ্ধ হতো, অথবা উপদেশ গ্রহণ করত এবং উপদেশ তার উপকারে আসত। আর যে পরোয়া করে না, আপনি তার প্রতি মনোযোগ দিয়েছেন। সে পরিশুদ্ধ না হলে আপনার কোনো দায় নেই। যে আপনার কাছে ছুটে এলো। আর সে ভয় করে। আপনি তার থেকে বিমুখ হলেন। কখনও এরূপ করবেন না, এটি উপদেশ বাণী’ (সূরা আবাসা : ১-১১)।

এরপর থেকে রাসূলুল্লাহ (সা.) প্রতিবন্ধীদের বিশেষ গুরুত্ব দিতে থাকেন। হজরত আয়েশা (রা.) বলেন, রাসূল (সা.) দু’বার জিহাদে যাওয়ার সময় আবদুল্লাহ ইবনে উম্মে মাকতুমকে তাঁর স্থলাভিষিক্ত করেন। মসজিদে নববীতে তিনি তেরোবার নামাজের ইমামতি করেন (তিরমিজি ও মুস্তাদরেকে হাকিম)।

ইসলাম প্রতিবন্ধীদের বিশেষ ছাড় দিয়েছে। শরীয়তের বিধিবিধান পালনে অক্ষম ও প্রতিবন্ধীর জন্য সহনশীল ও ছাড় প্রদানের রীতি রয়েছে। সূরা বাকারায় নাজিল হয়েছে, ‘আল্লাহ কাউকে তার সাধ্যাতীত কোনো ভার দেন না’ (বাকারা-২৮৬)।

প্রতিবন্ধীদের করণীয় হচ্ছে- তারা ধৈর্যধারণ করবে (সূরা হাদিদ-২২, ২৩)। এটিকে আল্লাহর পক্ষ থেকে ভালোবাসা ও বিশেষ পরীক্ষা মনে করবে (তিরমিজি-১৪৩)। সে এমন বিশ্বাস পোষণ করবে যে, আল্লাহ অবশ্যই তাকে এর উত্তম বদলা দেবেন (বুখারি-মুসলিম)।

আমাদের উচিত তাদের ব্যাপারে সমাজে বিদ্যমান নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করে ইসলাম তাদের যে সম্মান, মর্যাদা ও অধিকার দিয়েছে তা নিশ্চিত করা। সর্বোপরি আল্লাহর কাছে তাকওয়া ছাড়া শারীরিক অবকাঠামোর কোনো মূল্য নেই। সুতরাং আল্লাহ আমাদের ইমানি ও মানবিক চেতনায় পদক্ষেপ গ্রহণের তৌফিক দিন- আমিন।

আজকের সাতক্ষীরা
আজকের সাতক্ষীরা