• শনিবার   ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২০ ||

  • আশ্বিন ১১ ১৪২৭

  • || ০৮ সফর ১৪৪২

আজকের সাতক্ষীরা
১৫৬

‘এই পরিস্থিতিতে ঘরে নামাজ আদায় ইসলামসম্মত’

আজকের সাতক্ষীরা

প্রকাশিত: ৭ এপ্রিল ২০২০  

করোনাভাইরাস সৃষ্ট বৈশ্বিক দুর্যোগে ক্ষমতাধর অনেক রাষ্ট্র আজ অসহায়। পৃথিবীজুড়ে বাড়ছে সংক্রমণের হার, বাড়ছে মৃত্যু। আমরাও এই উদ্বেগজনক পরিস্থিতি থেকে মুক্ত নই। এই মুহূর্তে প্রয়োজন জাতীয় ও রাজনৈতিক সমন্বয় এবং সঠিক দিক নির্দেশনা। মহামারি নিয়ে ইসলামের নির্দেশনা এবং এই পরিস্থিতিতে আলেমদের ভূমিকা কী হওয়া উচিত এবং সাধারণ মানুষের করণীয় বিষয়ে বলেছেন ইসলামিক ফাউন্ডেশনের বোর্ড অব গভর্নর মিছবাহুর রহমান চৌধুরী

করোনাভাইরাস নিয়ে কয়েকজন আলেমের মন্তব্যে সমাজে বিরূপ মানসিকতা তৈরি হচ্ছে। তারা বলছেন, এই পরিস্থিতি কাফেরদের প্রতি আল্লাহর গজব মাত্র, মুমিনদের জন্য পরীক্ষা। যদি গজব হিসেবে মুসলিমরা বিষয়টি মেনে নেয় তাহলে করোনায় আক্রান্ত রোগীর সেবা, মৃত ব্যক্তির সৎকার- সব বিষয়েই দ্বিধা তৈরি হবে। সামাজিকভাবে এই রোগীরা কোণঠাসা হয়ে পড়বেন, এমনকি চিকিৎসকদেরও অপ্রস্তুত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। করোনাভাইরাস সম্পর্কে আপনার অভিমত কী? মুসলমানদের এই পরিস্থিতিকে কীভাবে গ্রহণ করা উচিত?
 

মিছবাহুর রহমান চৌধুরী: আপনি জানতে চেয়েছেন, দু’একজন আলেম মন্তব্য করেছেন, করোনাভাইরাস কাফেরদের জন্য আল্লাহর গজব এবং মুমিনদের জন্য পরীক্ষা। তাদের এই মন্তব্যের বিষয়ে আমি কোনো মন্তব্য করব না। আমি মনে করি, করোনাভাইরাসের বিপদে আজ বিশ্ব আক্রান্ত, এই মুহূর্তে মানুষে মানুষে বিভেদ সৃষ্টি করে- এমন কোনো বক্তব্য শোভন নয়। রোগ শনাক্তকরণ কিট, পিপিইসহ বিভিন্ন সরঞ্জামাদি কাফেরদের কাছ থেকে কিনে তাদের ধাক্কা দিয়ে গজবের মধ্যে ফেলে দেওয়া কোনো মুমিনের কাজ হতে পারে না। অবশ্যই এটি মানবজাতির জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে মহাপরীক্ষা। মুমিনের উচিত এই বিপদ থেকে বিশ্ববাসীকে রক্ষায় আল্লাহর দরবারে বেশি বেশি দোয়া করা। বিজ্ঞানভিত্তিক সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেয়া, ধৈর্য ধারণ করা, সরকার ও চিকিৎসকদের পরামর্শ মেনে চলা, সতর্কতা ও সচেতনতা অবলম্বন করা এবং অন্যকে সুপরামর্শ দেয়া।

মহামারিতে গণজমায়েতকে ইসলাম কীভাবে দেখে। এই সময় জামাতে নামাজ পড়ার বিষয়ে ইসলামের বিধান কী?
 

মিছবাহুর রহমান চৌধুরী: মানুষ ও জিন আল্লাহ সৃষ্টি করেছেন আল্লাহর দাসত্বের জন্য। তবে, মানুষকে আল্লাহ তার খলিফা বা প্রতিনিধি হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন। মানবিক গুণাবলি ও বিবেক প্রদান করেছেন। আপনি প্রশ্ন করেছেন এই মুহূর্তে মসজিদে গিয়ে ও জামাতে নামাজ পড়ার বিষয়ে ইসলামে বিধান কী? দেখুন ইসলামের আইনের উৎস (১) আল কুরআন (২) সুন্নাহ বা আল হাদিস (৩) ইজমা (৪) কিয়াজ। এর কোনোটাতেই মহামারিতে জামাতে নামাজ পড়ার বিষয়ে কড়াকড়ি নেই। ইমলাম কি এত রূঢ়? ইসলাম সহজ একটা জীবন ব্যবস্থা। মানবজাতিকে বাঁচাবার জন্য এই পরিস্থিতিতে মসজিদের চেয়ে ঘরে নামাজ আদায় নিরাপদ, উত্তম এবং ইসলামসম্মত। যা কিছু মুমিনের জন্য নিরাপদ, তাই আল্লাহর পছন্দ। নিজের দোষে রোগে আক্রান্ত হয়ে আল্লাহর উপর দায় চাপিয়ে দেয়া মুমিনের কাজ হতে পারে না।

তাহলে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে এত দেরি হলো কেনো?
 

মিছবাহুর রহমান চৌধুরী: চীন থেকে এই ভাইরাস বিস্তৃত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমি বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে বলেছি, সর্বপ্রকার সভা-সমাবেশ, ওয়াজ মাহফিল, বিয়ে-শাদির অনুষ্ঠান, উরস মাহফিল, কুলখানি বন্ধ করে দেওয়ার জন্য। সরকার মুজিববর্ষ উপলক্ষে যে সব অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিল সেগুলোও বন্ধ করেছে। ধর্মীয় অনুষ্ঠানের বেলায় সরকার আলেমদের মতামতের দিকে লক্ষ্য রেখেছিল। আলেমরা সুস্পষ্ট কোনো বক্তব্য জাতির সামনে পেশ করতে পারেন নাই। অন্যান্য ধর্মাবলম্বীরাও তাদের ধর্মের জমায়েত বন্ধের ব্যাপারে স্পষ্ট করে কিছু বলেন নাই।  তারা শুধু অনুরোধের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিলেন। এই ব্যাপারে ধর্ম মন্ত্রণালয় কোনো ভূমিকা রাখতে পারে নাই। এই মন্ত্রণালয়টি প্রধানমন্ত্রীর দিক নির্দেশনার প্রতি কোনো লক্ষ্যই রাখে নাই। আপনি প্রশ্ন করেছেন, ইসলামিক ফাউন্ডেশনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে এত দেরি হলো কেনো? দুঃখজনক হলেও সত্য, শেখ মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ ধর্ম প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বপ্রাপ্তির পর আজও আনুষ্ঠানিকভাবে একটি বোর্ড মিটিং আহ্বান করেন নাই। অথচ ইসলামিক ফাউন্ডেশনের বোর্ড অব গভর্নরের তিনি চেয়ারম্যান। আমি ব্যক্তিগতভাবে বোর্ডের সভা আহ্বান করার জন্য একাধিকবার অনুরোধ করেছি। এই ব্যাপারে তিনি কর্ণপাত করেন নাই। এই ধরনের সীমাবদ্ধতাগুলো দুর্যোগকালীণ মুহূর্তে সিদ্ধান্ত নিতে দীর্ঘসূত্রিতা তৈরি করে।

ইসলামিক ফাউন্ডেশন ২৪ মার্চ এবং ২৯ মার্চ বিশিষ্ট আলেমদের মতামতের ভিত্তিতে যে ফতোয়া দেয় তাতে বলা হয়- ‘মসজিদের নিয়মিত আজান, ইকামত, জামাত ও জুমার নামাজ অব্যাহত থাকবে। তবে জুমা ও জামাতে মুসল্লিদের অংশগ্রহণ সীমিত থাকবে।’ কিন্তু এই ‘সীমিত’ শব্দটির পরিধি নির্ধারণ না-করায় জুমার নামাজের জামাত মসজিদ ছাড়িয়ে রাস্তা পর্যন্ত গিয়েছে। এটা কি প্রচারণার অভাবে হয়েছে নাকি ইমামরা সরকারি নির্দেশনা মানছেন না বলে আপনি মনে করেন?
 

মিছবাহুর রহমান চৌধুরী: হ্যাঁ, এই তথাকথিত ‘সীমিত’ শব্দের পরিধি নির্ধারণ না-করায় জুমার নামাজ মসজিদ ছাড়িয়ে রাস্তা পর্যন্ত গিয়েছে। এই ঘটনার দায় ধর্ম প্রতিমন্ত্রী এবং তার মন্ত্রণালয়কে বহন করতে হবে।

ধর্ম মন্ত্রণালয় গত ৬ এপ্রিল সিদ্ধান্ত নিয়েছে-সাধারণ জামাতে অনধিক পাঁচজন এবং জুমার জামাতে অনধিক দশজন মুসল্লি মসজিদে প্রবেশ করতে পারবেন। এই আইন কি মান্য হবে? বিশেষত সামনে শবে বরাত আসছে।
 

মিছবাহুর রহমান চৌধুরী: ধর্ম মন্ত্রণালয়কে ধন্যবাদ, দেরিতে হলেও তারা একটি নির্দেশনা জাতিকে দিয়েছে। এখনও এ নির্দেশনায় অস্পষ্টতা আছে। বলা হয়েছে, অনধিক পাঁচজন মুসল্লি অংশ নিতে পারবেন। এর মধ্যে ইমাম, মুয়াজ্জিন, খাদেম মিলে তিনজন হয়। বাকি দু’জন কীভাবে নির্ধারিত হবেন? এই দু’জনের অপশন থাকাতে অনেকেই হয়তো মসজিদে যাওয়ার চেষ্টা করবেন। অন্তত এটা স্পষ্ট করে যদি বলা হতো, মসজিদ কমিটি কর্তৃক নির্ধারিত দু’জন মুসল্লি, তাহলে বিষয়টি অনেক পরিষ্কার হয়ে যেত। পরিস্থিতি আরো খারাপ হলে কী সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতে আরো আসতে পারে তারও একটা ইঙ্গিত মন্ত্রণালয় দিতে পারত।

তাছাড়া শুধু নির্দেশনাই কি যথেষ্ট? এর আগেও তো নির্দেশনা ছিল কিন্তু তার প্রয়োগ ছিল না। নির্দেশনার পাশাপাশি নির্দেশ মানছে কিনা তাও দেখার দায়িত্ব কিন্তু ধর্ম মন্ত্রণালয় এড়াতে পারে না। আমি মুসলমানদের বিনীত অনুরোধ করছি, তাঁরা যেনো ঘরে নামাজ পড়েন। শবে বরাতের কথা বলছেন? এই বিষয়েও আমার একই অনুরোধ। আনুষ্ঠানিকভাবে কোরআন খতম, মিলাদ-মাহফিল ইত্যাদির নামে লোক জমায়েত বন্ধ রাখুন আপনারা। ঘরে বসেই বেশি বেশি তেলোয়াত করুন, দরুদ পাঠ করুন, নফল রোজা রাখুন। সর্দি-কাশি, শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে সঙ্গে সঙ্গে ডাক্তারকে অবগত করুন। আরেকটা বিষয়- সম্প্রতি করোনাকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন জায়গায় গুজব দেখা দিচ্ছে। এভাবে একসঙ্গে, একযোগে আজান দিয়ে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করার বিধান ইসলামে নেই। সব ধরনের গুজব থেকে প্রকৃত মুসলমান দূরে থাকবেন- এটা আমার বিশ্বাস। আল্লাহ আমাদের সহায় হোন। তিনি আমাদের রক্ষক এবং হেফাজতকারী।

আজকের সাতক্ষীরা
আজকের সাতক্ষীরা
সাক্ষাৎকার বিভাগের পাঠকপ্রিয় খবর